চাই না ইতিহাস সাক্ষ হয়ে থাকুক..
হজরত উমর (রা) এর আমলে একদিন দুই ভাই একটি ছেলেকে টানতে টানতে কোর্টে নিয়ে আসলো
উমর (রা) জিজ্ঞেস করলেন,
কি হয়েছে? কি এতো হৈচৈ? কি অপরাধ তার?
“হে আমিরুল মুমিনীন, এই ছেলে আমাদের বাবাকে হত্যা করেছে!”
“কথা কি সত্য?” ছেলেটিরর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন!
“জি আমিরুল মুমিনীন, তবে তা নিতান্তই ভুল বসত!” এবং সে পুরো ঘটনা ভেঙে বললো।
উমরের (রা) তখন দু ভাই কে বললেন,
এই ভুলের জন্য তোমরা কি তাকে ক্ষমা করতে চাও?
“না! আমিরুল মুমিনীন! আমরা বদলা নিতে চাই!”
“বেশ, তোমার কোনো শেষ ইচ্ছে?” ছেলের দিকে তাকিয়ে আবার প্রশ্ন।
“জি আমিরুল মুমিনীন, আমার বাবা নেই, তবে তিনি আমার আর আমার ছোট ভাই এর জন্য কিছু সম্পদ লুকিয়ে রেখে গিয়েছেন , আমাকে তিন দিনের সময় দিন, আমি সেটা বের করে আমার ভাই কে বুঝি দিচ্ছি আসছি।”
উমরের (রা) ভাবলেন, ছেলেটি পালানোর পায়তারা করছে না তো?
তাই বললেন,
“তিন দিন সময় দেয়া হবে, যদি তুমি কোনো গেরানটার বের করতে পারো”
গেরানটার হওয়া মানে, পূর্ণ দায়িত্ব নেয়া, অর্থাৎ ছেলেটি যদি ফিরে না আসে তাহলে কল্লা কর্তন গেরান্টেরের
কে নিবে এই রিস্ক?
ছেলেটি কোর্টের চার পাসে করুন ভাবে তাকিয়ে বললো
কেউ কি নেই আজ আমাকে সাহায্য করার জন্য?
সবাই মাথা নিচু করে রাখলো, পাছে চোখচোখি না হয়ে যায়!
হটাৎ পিছন থেকে একটা হাত উঠলো,
হাত উঠলেন রাসূলের অন্যতম বিশ্বস্ত সাহাবী হজরত আবু যার আল-গিফারী
————————————————-
প্রথম দিন গেলো ছেলেটির কোনো খোঁজ নেই
দ্বিতীয় দিন গেলো, এখনো ফিরেনি!
তৃতীয় দিন গেলো! ছেলেটি স্টিল লাপাত্তা।
দু ভাই আবু যার (রা) এর দরজায় এসে হাজির
তারা হাটছে,
সাথে হাটছে মদিনাবাসি
শঙ্কা, আজ কি হবে?
রাসূলের প্রিয় সাথী! একটি ছেলের ভুলের কারণে এভাবেই মারা যাবে?
অন্য দিকে, আবু যার (রা) এর দৃঢ় বিশ্বাস, এখনো সময় আছে! ছেলেটি ফিরে আসবেই।
সূর্য অস্তের ঠিক কয়েক মিনিট পূর্বে ছেলেটি ফিরে এলো
খুশিতে সবাই আত্মহারা!
উমর (রা) ছেলেটিকে প্রশ্ন করলেন,
তুমিতো পালিয়ে যেতে পারতে, ফিরে এলে কেন?
ছেলেটির উত্তর: আমি চাইনি ইতিহাস সাক্ষ হয়ে থাকুক যে এক জন মুসলমান কথা দিয়েছে অথচ সে কথা রাখেনি
উমর (রা) তখন আবু যার (রা) কে জিজ্ঞেস করলেন,
আপনি কেন সেই দিন এই ছেলের জন্য সাহায্যের হাত তুলেছিলেন?
আবু যারের উত্তর: আমি চাইনি ইতিহাস সাক্ষ হয়ে থাকুক যে একজন মুসলমান সাহায্য চেয়েছে অথচ কেউ তাকে সাহায্যের হাত বাড়ায়নি
এ কথা শুনে দু ভাই তখন বলে উঠল,
“আমরা তাকে ক্ষমা করে দিলাম”
আমরাও চাই না ইতিহাস সাক্ষ হয়ে থাকুক,
এক মুসলমান আরেক মুসলমানের কাছে ক্ষমা চেয়েছে অথচ তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয় নি! [১]
এ ছিল মুসলমানদের আদর্শ
আমল নয়, আখলাক দিয়েই তাঁরা মানুষের মন জয় করেছিলেন
রোজা রাখুন, নামাজ পড়েন বা কুরআন খতম দেন যেই আমলই করেন না কেন এই রমজানে অন্তত একটা প্রতিজ্ঞা নিজের সাথে অবস্যই করুন
আর তা হলো, এই রমজানে আপনি আপনার আখলাক ইম্প্রোভ করার মিশন হাতে নিবেন!
কারণ
“হাশরের ময়দানের কোন আমলটি ওজনে সব থেকে ভারী হবে জানেন?” – “তা হলো আপনার আখলাক” [২]
যেমন:
কাউকে প্রমিস করলে সেটা রক্ষা করুন
কথা বললে সত্যই বলুন,
প্রতারণা বা মিথ্যে তো কখনই না
মানুষের সাথে আরো সদয় হন, সহনশীল হন ও নমনীয় হন
অযথা বিতর্কে জড়াতে যাবেন না
যখনি সুযোগ হবে হেল্প এর হাত বাড়িয়ে দিন
কারো বদনাম বা খোটা দিয়ে কথা আর নয় বরং তার অনুপুস্থিতিতে তার প্রশংসা করুন
বিচার করলে ইনসাফের সাথেই করুন যদিও তা নিজের বিপক্ষে যায়
মানুষের সাথে হেসে কথা বলুন
ভালোবেসে তাকে কিছু গিফট পাঠিয়ে দিন
কেউ কষ্ট দিয়ে থাকলে মাফ করে দিন
খেয়াল করুন,
সারাদিন যেই সত্তা দেখছে এই বিশ্বাসে লুকিয়ে পানিটা পর্যন্ত খেলেন না,
সেই একই সত্তাকে খুশি করার জন্য কি উপরুক্ত কষ্ট গুলো করতে পারবেন না?
এগুলোও তো ইবাদাহ!
Reference:
[১] ঘটনাটি বিখ্যাত কানাডিয়ান ধর্ম প্রচারক সেইখ নাভাইদ আজিজ এর লেকচার হতে সংকলিত, এ ছাড়াও জানতে পেরেছি গল্পটি ইসলামের প্রথম দিককার বিখ্যাত লেখক ইবনে সাদের প্রসিদ্ধ বই কিতাব এত তাবাকাত আল খবির এ লিপিবদ্ধ আছে
[২] সহি তিরমিযী ২০০২

Leave a Comment